হিন্দুধর্মে মহালয়ার দিনে পিতৃ পুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করা হয় কেন!

0
9

ডেটলাইন দুর্গাপুরঃ দেখতে দেখতে এগিয়ে আসছে বাংলার সব উৎসবের সেরা দুর্গাপুজো। মহালয়ার দিন থেকেই পুজোর কাউন্ট ডাউন শুরু হয়ে যায়। সোজা কথায় মহালয়া আসা মানেই যেন পুজো প্রায় শুরু হয়ে যাওয়া। হিন্দু ধর্মে এই মহালয়ার দিনটার একটা আলাদা তাৎপর্য আছে। মহালয়াকে বলা হয় পিতৃপক্ষের শেষ ও দেবীপক্ষের সূচনা। এই দিনেই পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ করা হয়। তাঁদের জলদান করে তাঁদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা জানানো হয়। সেই কারনেই বিভিন্ন ঘাটে ঘাটে ভোর থেকেই ভীড় জমে যায়। মহালয়া সম্পর্কে পুরাণ থেকে জানা যায় যে জীবিত ব্যক্তির তিন পুরুষ পর্যন্ত পিতৃলোকে বাস করেন। এই পিতৃলোক স্বর্গ ও মর্ত্যের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত একটি স্থান যার অধিষ্ঠাতা দেবতা হলেন স্বয়ং যম। মৃত্যুর দেবতা যমই কার্যত মৃত ব্যক্তির আত্মাকে মর্ত্য বা পৃথিবী থেকে তাঁর মৃত্যুর পর পিতৃলোকে নিয়ে যান। আর তারপর বংশের পরবর্তী প্রজন্মের কারুর যখন মৃত্যু হয়,তখন সেই ব্যক্তি পিতৃলোক ছেড়ে স্বর্গে গিয়ে ঈশ্বর বা পরমাত্মায় মিশে যান। অন্যান্য নানা হিন্দু শাস্ত্রগ্রন্থ অনুযায়ী পিতৃপক্ষের সূচনা তখনই হয় যখন সূর্য কন্যারাশিতে প্রবেশ করে। হিন্দুরা বিশ্বাস করে থাকেন,পিতৃপক্ষের এই সূচনায় তাঁদের পূর্ব পুরুষরা পিতৃলোক ত্যাগ করে তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের গৃহে গিয়ে অবস্থান করেন। পরে যখন সূর্য আবার যথা সময়ে বৃশ্চিকরাশিতে প্রবেশ করে তখন তাঁরা আবার পিতৃলোকে পুনর্গমন করেন। আর পূর্ব পুরুষরা যেহেতু তাঁদের গৃহে অবস্থান করেন তাই তর্পণের উদ্দেশ্যে এইসময় তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন হিন্দুরা।

হিন্দুধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী কোনো শুভ কাজ করতে গেলেই প্রয়াত পূর্ব পুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করতে হয়, তাঁদের প্রণাম জানিয়ে কাজটি শুরু করতে হয়। রামচন্দ্র যখন লঙ্কা বিজয়ের আগে দেবীকে অকালবোধনে মর্ত্যে আনেন,তখনও তিনি পূর্ব পুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করেন। এই দিনে প্রয়াত আত্মারা মর্ত্যে আসেন। প্রয়াত আত্মাদের এই মর্ত্যে আগমনকে বলা হয় মহালয়,সেই থেকেই কিন্তু এসেছে মহালয়া কথাটি। মহালয়া আবার পিতৃপক্ষের শেষ দিনও! আবার মহাভারতে তর্পণ সম্পর্কে অন্য একটি কাহিনী পাওয়া যায়। দাতা কর্ণের মৃত্যুর পর তাঁর আত্মা স্বর্গে গেলে তাঁকে সোনা ও মূল্যবান ধনরত্ন খাদ্য হিসেবে দেওয়া হয়। যথারীতি কর্ণ অবাক হয়ে দেবরাজ ইন্দ্রকে এর কারণ জিজ্ঞেস করেন। তখন দেবরাজ জানান, যে কর্ণ তাঁর সারা জীবনে অনেক দানকর্ম করলেও প্রার্থিত ব্যক্তিকে শুধুমাত্র মূল্যবান ধনরত্নই দিয়ে গেছেন। কিন্তু তাঁর পিতৃ পুরুষের উদ্দেশ্যে কখনও খাবার দেননি। জীবদ্দশায় পিতৃ পুরুষের প্রতি অবহেলা দেখানোর জন্য তাঁকে সোনা ও ধনরত্ন খাদ্য হসেবে দেওয়া হয়েছে। কর্ণ তখন তাঁর অনিচ্ছাকৃত ভুল স্বীকার করে নিলে তাঁকে ষোলো দিনের জন্য আবার পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে পূর্ব পুরুষদের উদ্দেশ্যে খাদ্য ও জল দান করার অনুমতি দেন ইন্দ্র। আর সেই থেকে এই ষোল দিনের পর্ব নাকি পিতৃপক্ষ নামে পরিচিত হয়। কোনো কোনো জায়গায় এখানে দেবরাজ ইন্দ্রের স্থানে মৃত্যু দেবতা যমকেও আমরা দেখি। এছাড়া গরুড় পুরাণে আছে ‘পুত্র ছাড়া মুক্তি নেই’। তাই তর্পণের মাধ্যমে পুত্রের পিতা ও পূর্ব পুরুষের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা অন্ন ও জলই কার্যত পূর্ব পুরুষের মুক্তির উপায় বা মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। তাই হিন্দুধর্মে মহালয়ার দিনে পিতৃ পুরুষের উদ্দেশ্যে যে তর্পণ করা হয়,তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে যুগ যুগ ধরে এই প্রথা চলে আসছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here